ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের আলোয় ২২৫টি প্রদীপ: ডুমুরিয়ায় নারী শক্তির জাগরণ
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সবুজ শ্যামল গ্রামীণ জনপদ—যেখানে ভোরের সূর্য ওঠে কৃষি আর শ্রমজীবী মানুষের কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। এই চেনা জনপদে এখন এক নিরব অথচ শক্তিশালী রূপান্তর ঘটছে। একদল অদম্য গ্রামীণ নারী এখন শুধু গৃহিণী কিংবা শিক্ষার্থী নন, তারা এজেকজন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। আর এই রূপান্তরের নেপথ্যে দক্ষ সারথি হিসেবে কাজ করেছে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন।
পিছিয়ে পড়া থেকে স্বাবলম্বিতার অনন্য গল্প
ডুমুরিয়া উপজেলার গ্রামগুলোতে একসময় নারীদের আয়ের উৎস খুঁজে পাওয়া ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ সেই চিত্র বদলে গেছে। এখানকার নারী উদ্যোক্তারা এখন তাদের স্মার্টফোনটিকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে তারা আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।
স্টার্ট-আপ থেকে টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি
এই উদ্যোক্তাদের যাত্রাটা সহজ ছিল না। শুরুতে ক্ষুদ্র স্টার্ট-আপ হিসেবে কাজ শুরু করলেও আজ তারা পেশাদার ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছেন। ২০২১ সালে 'ম্যাক্স নিউট্রিওয়াশ' কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন এই উদ্যোগ থেমে যাবে। কিন্তু অদম্য এই নারীরা দমে যাননি। তারা এখন সরাসরি বিভিন্ন বড় কোম্পানির সাথে ব্যবসায়িক লিংকেজ তৈরি করেছেন এবং পাইকারি মূল্যে পণ্য সংগ্রহ করে ফেসবুক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি করছেন। এই ব্যবসায়িক দূরদর্শিতাই তাদের আজ স্বনির্ভর করেছে।
স্বাস্থ্যকর গ্রাম (HV) এবং শিশু খর্বকায় (Stunting) হ্রাসে অবদান
এই উদ্যোক্তারা কেবল বিক্রেতা নন, তারা স্বাস্থ্য সচেতনতার এজেকজন অগ্রদূত। তাদের প্রতিটি কাজের মূলে রয়েছে একটি 'স্বাস্থ্যকর গ্রাম' গড়ে তোলার লক্ষ্য:
- খর্বকায় রোধ: নিয়মিত উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তারা মায়েদের সচেতন করছেন যে সঠিক পুষ্টি এবং নিয়মিত ওজন মাপার মাধ্যমেই শিশুর খর্বকামনা বা স্টান্টিং (Stunting) রোধ করা সম্ভব। তাদের সরবরাহ করা উন্নত বীজ ও পুষ্টিকর খাবার সরাসরি শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রভাব ফেলছে।
- স্বাস্থ্যবিধি প্রচার: ল্যাট্রিন এক্সেসরিজ এবং মেডিসিন সরবরাহের মাধ্যমে তারা গ্রামে শতভাগ হাইজিন নিশ্চিত করছেন, যা পানিবাহিত রোগ কমিয়ে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করছে।
সরাসরি প্রকল্প সহায়তা থেকে উত্তরণ ও স্থায়িত্ব
ডুমুরিয়া মডেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো 'স্বনির্ভরতা'। সাধারণত প্রকল্প শেষ হলে উন্নয়ন থমকে যায়, কিন্তু এখানে উদ্যোক্তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
- সহায়তা বিমুখ কৌশল: তারা কৌশলগতভাবে গ্রামগুলোকে সরাসরি এনজিও বা প্রকল্প সহায়তার ওপর নির্ভর করা থেকে বিরত রাখছেন। মানুষ এখন সাহায্য নয়, বরং উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত পণ্য ও সেবা কিনছে।
- দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব: প্রজেক্টের স্টাফ না থাকলেও উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই স্বাস্থ্যকর গ্রামের প্রতিটি সূচক ধরে রাখতে কাজ করছেন। কারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা যত বাড়বে, তাদের ব্যবসার প্রসারও তত বাড়বে।
প্রভাবের দৃশ্যমান প্রতিফলন ও গর্বের বিজয়
ডুমুরিয়ার গ্রামে এখন বাড়িতে বাড়িতে মেডিসিন দেখা যায়, মায়েরা শিশুর ওজন মাপার গুরুত্ব বোঝেন এবং নিরাপদ পানি ব্যবহার করেন। এটিই প্রমাণ করে যে, সুযোগ এবং প্রযুক্তি পেলে একজন গ্রামীণ নারীও দক্ষ উদ্যোক্তা হয়ে পুরো সমাজের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে অবদান রাখতে পারেন।
ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের আলোয় জ্বলে ওঠা এই প্রদীপ এখন আর কারো ওপর নির্ভরশীল নন; নিজেদের অর্জিত আয়ে তারা পরিবারে সচ্ছলতা ও সমাজে সম্মান ফিরিয়ে এনেছেন।
উপসংহার
ডুমুরিয়া উপজেলার উন্নয়ন মানেই আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের উন্নয়ন। এই সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়া আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। তাদের এই ব্যবসায়িক বিপ্লব আজ টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য ও আধুনিক মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Related Stories
Mass Monitoring as a Catalyst for Trust, Learning, and Scale
At Max Foundation Bangladesh, monitoring is not just about ticking boxes. Mass Monitoring transforms monitoring into a collaborative journey where stakeholders come together to understand programmes, build trust through transparency, and create a practical learning platform.